এসআইআর (SIR) বিতর্ক: অমর্ত্য সেনকে নোটিশ! নেতাজি জয়ন্তীতে বিস্ফোরক মমতা

এসআইআর (SIR) বিতর্ক বা তথ্য যাচাইকরণ—প্রশাসনিক কাজের একটি সাধারণ অঙ্গ হলেও, বর্তমানে এই প্রক্রিয়াটিই রাজ্যে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন এবং বিশিষ্ট কবি জয় গোস্বামীর মতো ব্যক্তিত্বদের তথ্যে ‘অসামঞ্জস্য’ বা ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ (Logical Discrepancy) থাকার অভিযোগে নোটিশ পাঠানোয় শোরগোল পড়ে গিয়েছে রাজ্যজুড়ে।

​স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মজয়ন্তীর মঞ্চ থেকে তিনি আমলাতান্ত্রিক এই ত্রুটির বিরুদ্ধে সরব হন এবং প্রশ্ন তোলেন—যান্ত্রিক প্রক্রিয়ার নামে কি বিশিষ্টজনেদের অপমান করা হচ্ছে?

​কী এই এসআইআর (SIR) বিতর্ক?

​রাজ্যে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প এবং নাগরিক তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য এসআইআর (SIR) বা তথ্য যাচাইকরণ প্রক্রিয়া চালানো হয়। এটি মূলত একটি স্বয়ংক্রিয় বা সেমি-অটোমেটেড প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে ডেটাবেসে থাকা তথ্যের সঙ্গে বাস্তবের মিল খোঁজা হয়।

​সম্প্রতি এই প্রক্রিয়ার অভাবেই অমর্ত্য সেন এবং জয় গোস্বামীর মতো বরেণ্য ব্যক্তিদের কাছে নোটিশ পাঠানো হয়। তাঁদের তথ্যে নাকি ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ পাওয়া গেছে। বিষয়টি সামনে আসতেই সাধারণ মানুষ এবং বুদ্ধিজীবী মহলে বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়।

​নেতাজি জয়ন্তীতে মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষোভ

​২৩ জানুয়ারি, রেড রোডে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখানেই তিনি এই এসআইআর বিভ্রাট নিয়ে নিজের অসন্তোষ গোপন রাখেননি। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, যান্ত্রিক বা প্রযুক্তিগত কারণ দেখিয়ে বিশিষ্ট মানুষদের হয়রান করা বা তাঁদের নাগরিকত্ব/তথ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা মেনে নেওয়া হবে না।

“কম্পিউটার বা যান্ত্রিক ত্রুটির দোহাই দিয়ে বাংলার গুণী মানুষদের অপমান করা হচ্ছে। এটা আমি বরদাস্ত করব না।” — মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

​”নেতাজি বেঁচে থাকলে কি তাঁকেও ডাকা হতো?”

​মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশটি ছিল তাঁর তোলা একটি প্রশ্ন, যা উপস্থিত জনতা এবং প্রশাসনিক কর্তাদের স্তব্ধ করে দেয়। তিনি বলেন:

“নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তবে কি তাঁকেও শুনানিতে ডাকা হতো? তাঁকেও কি লাইনে দাঁড়িয়ে প্রমাণ দিতে হতো তিনি কে?”

​এই একটি প্রশ্নেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বুঝিয়ে দিয়েছেন, আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বা ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’-র (Logical Discrepancy) নামে শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো কতটা অযৌক্তিক।

​কেন এই ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’?

​প্রশাসনিক সূত্রে খবর, অনেক সময় ডেটাবেসে বয়সের হিসেব, নামের বানান বা ঠিকানার তথ্যে সামান্য গরমিল থাকলেই কম্পিউটার সেটিকে ‘সন্দেহজনক’ বা ‘ত্রুটিপূর্ণ’ (Discrepancy) হিসেবে চিহ্নিত করে। একেই বলা হচ্ছে লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি।

  • যান্ত্রিক সীমাবদ্ধতা: কম্পিউটার সফটওয়্যার ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদা বা পরিচিতি বোঝে না, সে শুধু ডেটা বোঝে।
  • হিউম্যান টাচ-এর অভাব: এই তালিকা চূড়ান্ত করার আগে আধিকারিকরা যদি ম্যানুয়ালি যাচাই করতেন, তবে হয়তো অমর্ত্য সেনের মতো মানুষকে নোটিশ পেতে হতো না।

​আগামীর পদক্ষেপ কী?

​মুখ্যমন্ত্রীর কড়া বার্তার পর নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। আশা করা হচ্ছে, এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়ায় এবার ‘হিউম্যান ইন্টারভেনশন’ বা মানবিক বিচারবুদ্ধির প্রয়োগ বাড়ানো হবে। বিশিষ্টজনেদের যাতে অকারণে হয়রানির শিকার না হতে হয়, সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

​আপনার মতামত কী?

​প্রযুক্তির ভুল, নাকি প্রশাসনিক গাফিলতি—অমর্ত্য সেনের মতো মানুষের কাছে এমন নোটিশ যাওয়াকে আপনি কীভাবে দেখছেন? কমেন্ট করে আমাদের জানান।

​❓ সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

১. এসআইআর (SIR) বা তথ্য যাচাইকরণ প্রক্রিয়াটি আসলে কী?

এসআইআর (SIR) বা স্টেট ইনফরমেশন রিপোজিটরি (State Information Repository) যাচাইকরণ হলো একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। এর মাধ্যমে সরকারি ডেটাবেসে থাকা নাগরিকদের নাম, বয়স, ঠিকানা এবং অন্যান্য তথ্যের সঙ্গে বাস্তবের মিল আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হয়। মূলত সরকারি প্রকল্পের সুবিধা সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করতেই এটি করা হয়।

২. অমর্ত্য সেন ও জয় গোস্বামীর মতো বিশিষ্টদের কেন নোটিশ পাঠানো হলো?

এটি মূলত একটি যান্ত্রিক বা সফটওয়্যার-জনিত ত্রুটি। কম্পিউটারের ডেটাবেসে থাকা তথ্যের সঙ্গে বর্তমান তথ্যের কোনো ছোটখাটো অমিল (যেমন বয়সের হিসেব বা নামের বানান) থাকলে সিস্টেম সেটিকে ‘ত্রুটিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করে। একেই বলা হচ্ছে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’। এই অটোমেটেড প্রক্রিয়ার ফলেই বিশিষ্টদের কাছে ভুলবশত নোটিশ পৌঁছেছে।

৩. ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ (Logical Discrepancy) বলতে কী বোঝায়?

যখন দুটি তথ্যের মধ্যে যুক্তিসঙ্গত মিল থাকে না, তখন তাকে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ বলা হয়। উদাহরণস্বরূপ, কারও জন্ম সাল এবং বর্তমান বয়সের হিসেবে যদি গরমিল থাকে, অথবা বাবা ও ছেলের বয়সের ব্যবধান অবাস্তব দেখায়, তখন কম্পিউটার সিস্টেম সেটিকে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ হিসেবে চিহ্নিত করে।

৪. এই ঘটনায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিক্রিয়া কী?

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, যান্ত্রিক ত্রুটির দোহাই দিয়ে বিশিষ্টজনদের অপমান করা বা সাধারণ মানুষকে হয়রান করা চলবে না। তিনি আমলাদের নির্দেশ দিয়েছেন, শুধুমাত্র কম্পিউটারের ওপর ভরসা না করে যেন মানবিক বিচারবুদ্ধি বা ‘হিউম্যান টাচ’ প্রয়োগ করা হয়।

৫. সাধারণ মানুষের কি এই এসআইআর (SIR) নিয়ে চিন্তার কারণ আছে?

মুখ্যমন্ত্রীর কড়া নির্দেশের পর প্রশাসন এই ত্রুটিগুলি শুধরে নেওয়ার কাজ শুরু করেছে। আশা করা হচ্ছে, এখন থেকে যাচাইকরণ প্রক্রিয়ায় আরও সতর্কতার সঙ্গে কাজ করা হবে, যাতে সাধারণ মানুষ বা বিশিষ্টজন—কেউই অকারণে হয়রানির শিকার না হন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top