ভারতের রেলপথে সবুজ বিপ্লব: ডিজেলের দিন শেষ, ধোঁয়াহীন আগামীর পথে ছুটবে দেশের প্রথম হাইড্রোজেন ট্রেন

রেলের ইতিহাসে আজ এক নতুন সোনালি অধ্যায় রচিত হতে চলেছে, যা কেবল পরিবহন ব্যবস্থাকেই বদলে দেবে না, বরং পরিবেশ রক্ষার লড়াইয়ে ভারতকে বিশ্বের দরবারে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেবে। দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ভারতীয় রেললাইনের বুকে গড়াতে চলেছে দেশের প্রথম হাইড্রোজেন চালিত ট্রেনের চাকা। ডিজেল ইঞ্জিনের কালো ধোঁয়া আর ইলেকট্রিক তারের জঞ্জাল থেকে মুক্তি দিয়ে, সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব উপায়ে যাত্রী পরিবহনের এই উদ্যোগকে ইতিমধ্যেই বিশেষজ্ঞরা এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। হরিয়ানার জিন্দ থেকে সোনিপথ রুটে এই বিশেষ ট্রেনের ট্রায়াল রান শুরু হওয়ার খবরে এখন সারা দেশজুড়ে প্রবল উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, কারণ এই প্রযুক্তির সফল বাস্তবায়ন ভারতকে জার্মানি বা চীনের মতো হাতে গোনা কয়েকটি উন্নত দেশের তালিকায় স্থান করে দেবে।হাইড্রোজেন ট্রেন বা ‘হাইড্রোজেন ফর হেরিটেজ’ প্রজেক্টের মূল আকর্ষণ হলো এর প্রযুক্তি, যা সাধারণ ট্রেনের তুলনায় সম্পূর্ণ আলাদা এবং অভিনব। সাধারণ ট্রেন যেখানে জীবাশ্ম জ্বালানি বা ডিজেল পুড়িয়ে শক্তি উৎপন্ন করে এবং প্রচুর পরিমাণে কার্বন ডাই-অক্সাইড বাতাসে মিশিয়ে দেয়, সেখানে হাইড্রোজেন ট্রেন কাজ করে অত্যাধুনিক ফুয়েল সেল প্রযুক্তির মাধ্যমে। এই ট্রেনের ছাদে বা বিশেষ বগিতে রাখা থাকে বিশাল হাইড্রোজেন সিলিন্ডার, যেখান থেকে হাইড্রোজেন গ্যাস ফুয়েল সেলে প্রবেশ করে এবং বাতাসের অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া ঘটিয়ে বিদ্যুৎ তৈরি করে। এই প্রক্রিয়ায় কোনো ধোঁয়া বা বিষাক্ত গ্যাস উৎপন্ন হয় না, বরং সাইলেন্সার দিয়ে বেরিয়ে আসে শুধুমাত্র জলীয় বাষ্প বা বিশুদ্ধ পানি। অর্থাৎ, এই ট্রেন যখন আপনার পাশ দিয়ে ছুটে যাবে, তখন ধোঁয়ার বদলে এক পশলা জলীয় বাষ্প রেখে যাবে, যা পরিবেশের জন্য ১০০ শতাংশ নিরাপদ।হরিয়ানার জিন্দ থেকে সোনিপথ পর্যন্ত প্রায় নব্বই কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথকে বেছে নেওয়া হয়েছে এই ঐতিহাসিক যাত্রার সূচনার জন্য। রেল কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই রুটে ট্রেনটি প্রাথমিকভাবে ঘণ্টায় একশো দশ থেকে একশো চল্লিশ কিলোমিটার গতিবেগে ছুটবে। আটটি বগি বিশিষ্ট এই ট্রেনটির ডিজাইন করা হয়েছে অনেকটা আধুনিক মেট্রো রেলের ধাঁচে, যেখানে যাত্রীদের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য থাকছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং স্বয়ংক্রিয় দরজা। তবে এই ট্রেনের সবচেয়ে বড় চমক হলো এর মাইলেজ বা দক্ষতা; মাত্র তিনশো ষাট কেজি হাইড্রোজেন গ্যাস ব্যবহার করে এই ট্রেন প্রায় একশো আশি কিলোমিটার পথ অনায়াসেই পাড়ি দিতে সক্ষম হবে, যা প্রচলিত ডিজেল ইঞ্জিনের তুলনায় দীর্ঘমেয়াদে অনেক বেশি সাশ্রয়ী।পরিবেশ এবং অর্থনীতির ওপর এই প্রকল্পের প্রভাব সুদূরপ্রসারী এবং অত্যন্ত ইতিবাচক। বর্তমানে ডিজেল চালিত ট্রেনগুলো থেকে নির্গত ধোঁয়া বায়ুদূষণের অন্যতম প্রধান কারণ, কিন্তু হাইড্রোজেন ট্রেনের ‘জিরো কার্বন এমিশন’ বা শূন্য কার্বন নিঃসরণ নীতি ভারতকে তার ‘নেট জিরো’ বা দূষণমুক্ত দেশ গড়ার লক্ষ্যের দিকে এক বড় ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে। এছাড়া ডিজেল ইঞ্জিন বা ইলেকট্রিক ইঞ্জিনের মতো এই ট্রেন চলার সময় কোনো বিকট শব্দ তৈরি করে না, ফলে যাত্রীরা এক শান্ত ও আরামদায়ক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা পাবেন। অন্যদিকে, ইলেকট্রিক ট্রেনের জন্য যেমন রেললাইনের ওপরে মাইলের পর মাইল বৈদ্যুতিক তার এবং খুঁটি বসানোর প্রয়োজন হয়, হাইড্রোজেন ট্রেনের ক্ষেত্রে সেই ঝামেলার কোনো বালাই নেই, যা রেলের পরিকাঠামো তৈরির খরচ এবং রক্ষণাবেক্ষণের জটিলতা উভয়ই কমিয়ে দেবে।ভারতের মতো বিশাল দেশে যেখানে রেল পরিবহন ব্যবস্থার মেরুদণ্ড, সেখানে এই পরিবর্তন আনা খুব একটা সহজ কাজ ছিল না, কিন্তু ভারতীয় ইঞ্জিনিয়ারদের মেধা এবং সরকারের সদিচ্ছায় তা আজ বাস্তবে রূপ নিতে চলেছে। জার্মানি বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে এই প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করেছিল, এবং তারপর ফ্রান্স ও চীন এই পথে হেঁটেছে। এখন ভারত নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি এই ট্রেন নামিয়ে প্রমাণ করে দিল যে প্রযুক্তিগত দিক থেকে আমরাও পিছিয়ে নেই। রেল মন্ত্রকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই পরীক্ষামূলক যাত্রা সফল হলে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের বিভিন্ন রুটে, বিশেষ করে দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে, নীলগিরি মাউন্টেন রেলওয়ে এবং কালকা-শিমলার মতো হেরিটেজ রুটগুলোতে পয়ত্রিশটিরও বেশি হাইড্রোজেন ট্রেন চালানো হবে, যা পর্যটকদের কাছে এক বাড়তি আকর্ষণ হয়ে উঠবে।এই প্রযুক্তি কীভাবে কাজ করে তা নিয়ে সাধারণ মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই, কিন্তু বিষয়টি আসলে বিজ্ঞানের এক চমৎকার প্রয়োগ। ট্রেনের ভেতরে থাকা হাইড্রোজেন স্টোরেজ ট্যাংক থেকে গ্যাস যখন ফুয়েল সেলে যায়, তখন সেখানে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে যে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়, তা সরাসরি ট্রেনের চাকায় লাগানো ট্র্যাকশন মোটরগুলোকে ঘোরাতে সাহায্য করে। প্রয়োজনে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যাটারিতে জমা রাখা হয়, যা ট্রেনকে স্টেশন ছাড়ার সময় বা পাহাড়ি পথে ওঠার সময় বাড়তি শক্তি যোগায়। এই পুরো প্রক্রিয়াটি এতই মসৃণভাবে সম্পন্ন হয় যে যাত্রীরা কোনো ঝাঁকুনি বা ইঞ্জিনের গর্জন ছাড়াই গন্তব্যে পৌঁছে যেতে পারবেন। এটি শুধু একটি যান্ত্রিক পরিবর্তন নয়, বরং এটি একটি মানসিকতার পরিবর্তন যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতির যত্ন নেওয়াটাও সমান জরুরি।উপসংহারে বলা যায়, হাইড্রোজেন ট্রেনের এই আগমন ভারতীয় রেলের ইতিহাসে এক নবজাগরণের সূচনা। জিন্দ থেকে সোনিপথের এই যাত্রা হয়তো একটি ছোট পদক্ষেপ, কিন্তু এর প্রভাব আগামী প্রজন্মের জন্য এক সবুজ ও সুস্থ পৃথিবী গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিশাল ভূমিকা রাখবে। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ভারত যেভাবে গ্রিন এনার্জি বা সবুজ শক্তির দিকে ঝুঁকছে, তাতে এই ট্রেন নিঃসন্দেহে এক বৈপ্লবিক উদাহরণ হয়ে থাকবে। আমাদের স্বপ্ন দেখার দিন শেষ, এখন সেই স্বপ্নের ট্রেনে চেপে জানলার পাশে বসে এক দূষণমুক্ত ভারতের সৌন্দর্য উপভোগ করার সময় সমাগত।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top