
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ফের সংঘাতের আবহ। রাজ্যে চলমান SIR (Special Identity Registration) বা বিশেষ পরিচয় নিবন্ধন প্রক্রিয়া নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই প্রক্রিয়াকে ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ‘আতঙ্ক সৃষ্টিকারী’ হিসেবে অভিহিত করে তিনি সরাসরি ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (CEC) জ্ঞানেশ কুমারের দ্বারস্থ হয়েছেন। তৃণমূল কংগ্রেসের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল নিয়ে তিনি নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং এই প্রক্রিয়া অবিলম্বে বন্ধ বা সংস্কারের দাবি জানান। এই প্রসঙ্গে, SIR প্রক্রিয়া বিতর্কের তাৎপর্যও উল্লিখিত হয়।
আজকের এই ব্লগে আমরা আলোচনা করব—SIR প্রক্রিয়া আসলে কী, কেন তৃণমূল কংগ্রেস এর বিরোধিতা করছে, নির্বাচন কমিশনের সাথে বৈঠকে ঠিক কী আলোচনা হলো এবং সাধারণ মানুষের ওপর এর কী প্রভাব পড়তে পারে। এছাড়াও, SIR প্রক্রিয়া বিতর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে আমাদের আলোচনা থাকবে।
SIR প্রক্রিয়া কী এবং কেন এই বিতর্ক?
SIR প্রক্রিয়া বিতর্কের প্রেক্ষাপট এবং ভবিষ্যৎ
SIR বা Special Identity Registration হলো একটি বিশেষ পরিচয় যাচাইকরণ প্রক্রিয়া, যা সম্প্রতি কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে শুরু হয়েছে। প্রশাসনের দাবি, ভুয়া ভোটার চিহ্নিতকরণ এবং নির্বাচনী তালিকার স্বচ্ছতা বজায় রাখতেই এই উদ্যোগ।
তবে, এই প্রক্রিয়ার বাস্তবায়ন নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন তুলেছে রাজ্যের শাসক দল। তাদের দাবি:
- নথিপত্রের জটিলতা: সাধারণ মানুষের কাছে এমন সব পুরনো নথিপত্র চাওয়া হচ্ছে যা জোগাড় করা অনেকের পক্ষেই অসম্ভব।
- হয়রানি: বাড়ি বাড়ি গিয়ে সার্ভে করার নামে নির্দিষ্ট কিছু সম্প্রদায়ের মানুষকে টার্গেট করা হচ্ছে।
- এনআরসি (NRC)-র ছায়া: বিরোধীরা অভিযোগ করছেন, এই প্রক্রিয়াটি ঘুরপথে এনআরসি বা সিএএ (CAA)-র মতোই সাধারণ মানুষকে নাগরিকত্ব প্রমাণের যাঁতাকলে ফেলার কৌশল।
- বিজেপির ইন্ধন? তৃণমূলের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশেই কমিশন এই পদক্ষেপ নিচ্ছে। তাদের মতে, এটি বিজেপি-র এজেন্ডা বাস্তবায়নের একটি কৌশল মাত্র।
- সংখ্যালঘু এলাকা টার্গেট: দলের নেতাদের দাবি, পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখা যাবে যে SIR প্রক্রিয়াটি মূলত সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এবং তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এলাকাগুলোতেই বেশি জোরদার করা হচ্ছে।
- ডাটা প্রাইভেসি: নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে কতটা গোপনীয়তা রক্ষা করা হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
- নথিপত্র নিয়ে বিভ্রান্তি: অনেকেই জানেন না ঠিক কী কী কাগজ দেখাতে হবে। গুজব ছড়াচ্ছে যে, ১৯৫০ বা ১৯৭১ সালের আগের দলিল না থাকলে নাম বাদ যাবে।
- মহিলা ও বয়স্কদের ভোগান্তি: দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানো বা বারবার অফিসে চক্কর কাটা—এই গরমে বয়স্ক এবং মহিলাদের জন্য একপ্রকার শাস্তিস্বরূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা, যিনি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, বলেন:
“আমরা গরিব মানুষ, দিন আনি দিন খাই। এখন যদি কাজের সময় নষ্ট করে কাগজের পেছনে দৌড়াতে হয়, তাহলে খাব কী? আর শুনছি নাকি নাম বাদ গেলে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেবে। আমরা খুব ভয়ে আছি।”
নির্বাচন কমিশনের অবস্থান
যদিও নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সাংবাদিক সম্মেলন করেনি, তবে সূত্রের খবর অনুযায়ী, সিইসি জ্ঞানেশ কুমার মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগগুলি মন দিয়ে শুনেছেন। কমিশনের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে:
- কোনো বৈধ ভারতীয় নাগরিকের নাম তালিকা থেকে বাদ যাবে না।
- অভিযোগগুলি খতিয়ে দেখতে একটি বিশেষ পর্যবেক্ষক দল রাজ্যে পাঠানো হতে পারে।
- প্রক্রিয়াটিতে স্বচ্ছতা আনতে প্রয়োজনীয় গাইডলাইন সংশোধন করা হবে।
তবে, কমিশন এও জানিয়েছে যে নির্বাচনী তালিকার শুদ্ধিকরণ একটি রুটিন প্রক্রিয়া এবং এটি সম্পূর্ণ বন্ধ করা সম্ভব নয়।
ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণ
এই ঘটনা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, SIR ইস্যুটি আগামী নির্বাচনে তৃণমূলের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হতে চলেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বারবার প্রমাণ করেছেন যে তিনি রাস্তার লড়াইয়ে কতটা পারদর্শী। এবারও তিনি এই ইস্যুটিকে সামনে রেখে জনমত গঠনের চেষ্টা করবেন।
অন্যদিকে, বিরোধী দল বিজেপি দাবি করছে, তৃণমূল অনুপ্রবেশকারীদের আড়াল করতেই এই স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করছে। তাদের মতে, রাজ্যের ডেমোগ্রাফি বা জনবিন্যাস যেভাবে পাল্টাচ্ছে, তাতে এই ধরনের সার্ভে অত্যন্ত জরুরি।
উপসংহার: সাধারণ নাগরিক হিসেবে আপনার করণীয়
রাজনীতি তার নিজস্ব গতিতে চলবে, কিন্তু সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদের সচেতন থাকা জরুরি। SIR বা যেকোনো সরকারি সার্ভে নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে সঠিক তথ্য জানা প্রয়োজন।
- গুজবে কান দেবেন না: সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানো ভুয়া খবরে বিশ্বাস করবেন না।
- প্রশাসনিক সাহায্য নিন: কোনো সন্দেহ থাকলে স্থানীয় বিডিও (BDO) অফিস বা নির্বাচন কমিশনের হেল্পলাইনে যোগাযোগ করুন।
- নথিপত্র গুছিয়ে রাখুন: নিজের এবং পরিবারের পরিচয়পত্র (আধার, ভোটার কার্ড, রেশন কার্ড ইত্যাদি) হাতের কাছে রাখুন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই দিল্লি সফর এবং নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংঘাত শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে এটা নিশ্চিত যে, SIR ইস্যুটি বাংলার রাজনীতিতে আরও অনেক জলঘোলা করবে।
